বেরিবেরি রোগঃ বেরিবেরি রোগের মূলত ভিটামিন বি-১ বা থায়ামিনের অভাবে হয়ে থাকে। সিংহলি ভাষা থেকে বেরিবেরি শব্দের উৎপত্তি। যার অর্থ হচ্ছে- 'আমি পারি না'। 'আমি পারি না' এর মানে হচ্ছে- এ ধরনের রোগীরা ভীষণ দুর্বল হয়ে থাকে। তারা সাধারণত কোনো কাজকর্ম বা চলাফেরা করতে অন্য স্বাভাবিক মানুষের তুলনায় অনেক কষ্ট করে থাকে। এককথায় তারা কোনো কাজ করতে পারে না। ভিটামিন বি -১ বা থায়ামিনের অভাব হলে দেহের কোষ গ্লুকোজ ব্যবহার করতে পারে না। ফলে স্নায়ুতন্ত্র আক্রান্ত হয় এবং হার্টফেলজনিত ইডিমা হতে পারে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় শরীরে পানি আসার নাম হলো ইডিমা। ৪০ থেকে ৬০ বছর বয়সী নারীদের মাঝে এই রোগের প্রার্দুভাব বেশি দেখা যায়। বেরিবেরি ছাড়াও ভিটামিন বি -১ বা থায়ামিনের অভাবে ভারনিকে এনসেফালোপ্যাথি নামক আরেকটি রোগে আক্রান্ত হতে পারে।
বেরিবেরি রোগের লক্ষণ
ভিটামিন বি-১ বা থায়ামিনের অভাব থাকলে বেরিবেরি রোগের যে যে লক্ষণগুলো দেখা যায়। নিচে সেগুলো উল্লেখ করা হলো–
ওজন কমে যাওয়া
বেরিবেরি রোগে আক্রান্ত ব্যাক্তির ওজন দ্রুত কমতে থাকে। রোগীর শরীরের রক্তস্বল্পতার দেখা দেয় ফলে তার বেরিবেরি রোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
ক্ষুধা কমে যায়
বেরিবেরি রোগে আক্রান্ত ব্যাক্তির খাওয়ার প্রতি রুচি কমে যায় এবং একসময় তারা তাদের পছন্দনীয় খাবারগুলো আর খেতে চায় না।
বমি বা শারীরিক দুর্বলতা
এই রোগে আক্রান্ত ব্যাক্তির লক্ষণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বমি হওয়া বা শারীরিক দুর্বলতা। বেরিবেরি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির অধিক পরিমাণে বমি হয়।
মানসিক অবসাদ
বেরিবেরি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি সবসময় মানসিক অবসাদে ভোগে থাকে। যেকোনো কাজের প্রতি তাদের আগ্রহ হারিয়ে ফেলে এবং তাদের কাজ করার সমার্থ্য থাকে না।
শরীর ফুলে যায়
বেরিবেরি রোগের লক্ষণগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে- শরীর ফুলে যাওয়া। শরীরে রক্তস্বল্পতা থাকে এবং অনেক সময় পানি আসে।
ব্যথা
বেরিবেরি রোগে আক্রান্তদের হাত-পায়ে ব্যথা অনুভূত হয়। শরীরের দুর্বলতা দেখা দেওয়ার সাথে সাথে অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যথাও এই রোগের অন্যতম লক্ষণ।
অনিয়মিত হৃদস্পন্দন
বেরিবেরি রোগের অন্যতম আরেকটি লক্ষণ হচ্ছে রোগীর অনিয়মিতভাবে হৃদস্পন্দন থাকে। যদি অনিয়মিত ভাবে হৃদস্পন্দন হয়ে থাকে তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন।
বেরিবেরি রোগ হলে যেসব খাবার খেতে হবে
বেরিবেরি রোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে- ভিটামিন বি-১ বা থায়ামিনের অভাবে। তাই এই রোগে আক্রান্ত হলে আপনি যেসব খাবার খাবেন তা নিচে উল্লেখ করা হয়েছে।
★ বি.দ্রঃ শুধু যে, এই রোগের ব্যক্তিদের খাবার খেতে হবে তা না আমাদের উচিত সবাই এই খাবারগুলো পরিমিত প্রতিদিন খেয়ে থাকব।
১) কলা
২) স্কোয়াশ
৩) ছোলা
৪) মিষ্টি আলো
৫) কাজুবাদাম
৬) ওটস
৭) গরুর কলিজা
৮) মুরগির গোশত
৯) শস্য জাতীয় খাদ্য
১০) টমেটো
১১) কমলা
১২) সয়াবিন
১৩) মসুর ডাল
১৪) বিভিন্ন ধরণের শাকসবজি
১৫) দুধ
১৬) ডিম
১৭) মাছ
বেরিবেরি রোগীদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ডাক্তাররা এই খাবারগুলো খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।তাই এই রোগ থেকে মুক্তি পেতে এবং রোগটি প্রতিরোধ করতে অবশ্যই উপরুক্ত খাবার গুলো খাওয়ার চেষ্টা করুন।
বঙ্গবন্ধুর বেরিবেরি রোগ
শেখ মুজিবের জন্ম হয় তার মায়ের গর্ভের জ্যেষ্ঠ সন্তান হিসেবে। বাবা আর মায়ের আদর তার জন্য ছিল অবাধ ও উছলেপড়ার মতো। মায়ের হাতে আতপ চালের পায়েস তার ছিল প্রিয় খাবার। আর এ প্রিয়তাই তার জন্য হলো কাল। মাত্র ১৪ বছর বয়সে, ১৯৩৪ সালে তিনি যখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া, তখন তার পায়ের নিম্নাংশ ফুলে যেতে থাকে এবং হার্ট দুর্বল হয়ে যায়। হৃৎপিন্ডের স্পন্দনগতি দ্রুত হয়ে ওঠে। তার রোগের উপসর্গ থেকেই বোঝা যায়, তিনি ওয়েট বেরিবেরি রোগে ভুগছিলেন। ওয়েট বেরিবেরি রোগ হৃৎপিন্ড ও রক্ত সংবহনতন্ত্রকে আক্রমণ করে। অধিক হারে আতপ চালের পায়েস খাওয়ার কারণে তার দেহে ভিটামিন বি-১ বা থিয়ামিনের ঘাটতি হয়, যা মূলত বাঙালিরা তখনকার দিনে ঢেঁকিছাঁটা চাল থেকেই বেশি চাল তৈরি করত। চিকিৎসার জন্য তাকে কলকাতা নেওয়া হলে কলকাতার বিখ্যাত চিকিৎসক শিবপদ ভট্টাচার্য ও একে রায় চৌধুরী তার চিকিৎসা করেন। তারা তার রোগকে বেরিবেরি বলে নিরূপণ করেন ও আতপ চালের পায়েসে নিষেধাজ্ঞা এনে খোসাযুক্ত ঢেঁকিছাঁটা চালের ব্যবস্থাপত্র প্রদান করেন। ধীরে ধীরে রোগ ভালো হয়ে এলেও হৃদযন্ত্রের দুর্বলতা না কাটায় তার বাবা শেখ লুৎফর রহমান তাকে খুব বেশি ফুটবল খেলতে দিতেন না।
কিছু সম্পর্কিত প্রশ্নঃ
প্রশ্নঃ বেরিবেরি রোগের লক্ষণ?
উত্তরঃ শারীরিক দুর্বলতা অনুভব করা, পা ভারী হয়ে যাওয়া, হাত-পা অবশ আর ঝিনঝিন বোধ করা ইত্যাদি।
প্রশ্নঃ বেরিবেরি রোগ কোন ভিটামিন-এ'র কারণে হয়ে থাকে?
উত্তরঃ ভিটামিন বি-১ এর অভাবে বেরিবেরি রোগ হয়ে থাকে।
প্রশ্নঃ বঙ্গবন্ধু বেরিবেরি রোগ আক্রান্ত হয় কত সালে?
উত্তরঃ বঙ্গবন্ধু বেরিবেরি রোগ আক্রান্ত হয় ১৯৩৪ সালে। তার মাত্র ১৪ বছর বয়সে।
প্রশ্নঃ বেরিবেরি রোগ কেন হয়?
উত্তরঃ বেরিবেরি রোগ হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে- ভিটামিনের অভাবে এই রোগ হয়।
প্রশ্নঃ বেরিবেরি রোগ হলে কি হয়?
উত্তরঃ বেরিবেরি রোগ হলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে ও শরীর ফুলে যায়।
আমাদের শেষ কথাঃ
বেরিবেরি রোগ কি?বেরিবেরি রোগের লক্ষণ সম্পর্কে আপনারা ইতিমধ্যেই আজকের আর্টিকেল থেকে জানতে পেরেছেন। আপনাদের কারো কোন প্রশ্ন থাকলে অবশ্যই আমাদের কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না। নিয়মিত আরো বিভিন্ন বিষয়ে আর্টিকেল গুলো পেতে হলে অবশ্যই বাংলা টেকলিংক এর সাথেই থাকুন। আজকের মতো বিদায় নিচ্ছি। আল্লাহ হাফেজ
পোস্ট ট্যাগ-
বেরিবেরি রোগ কেন হয়,বেরিবেরি রোগ কোন ভিটামিনের অভাবে হয়,বঙ্গবন্ধুর বেরিবেরি রোগ,বেরিবেরি রোগ প্রতিরোধ করে কোন খাবার,বেরিবেরি রোগ কি ছবি,স্কার্ভি রোগ কি,স্কার্ভি রোগের লক্ষণ কি,রিকেটস রোগ কি।
আরও আপনার জন্য-

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন