দ্য স্পেশাল ওয়ান: জসে মরিনো কেন এত স্পেশাল?

why-the-Jose-Mourinho-spacial?

দ্য স্পেশাল ওয়ান: জসে মরিনো কেন এত স্পেশাল?

ফুটবল মানেই কি শুধু মেসি বা রোনালদোর জাদুকরী ড্রিবলিং? একদমই না। মাঠের বাইরে ডাগআউটে দাঁড়িয়ে থাকা কিছু মানুষও ফুটবলের ইতিহাস বদলে দিতে পারেন। তাদেরই একজন হলেন "জসে মরিনো (Jose Mourinho)"

ভক্তরা তাকে ডাকে 'দ্য স্পেশাল ওয়ান'। কেউ তাকে ভালোবাসেন, কেউ বা ঘৃণা করেন, কিন্তু তাকে এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব। আজকের ব্লগে আমরা জানব, কেন জসে মরিনো আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং বিশেষ একজন ম্যানেজার।

১. নিজেকে 'স্পেশাল ওয়ান' হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা

ক্যারিয়ারের শুরুতে পোর্তোর ম্যানেজার দিয়েই এই লিজেন্ড ও সর্বকালের সেরা কোচ জসে মরিনো পথযাত্রা শুরু। কোচিং শুরুর প্রথম বর্ষেই তিনটি টফি জিতেই চেলসির নজরে আসেন তিনি এবং পরবর্তীতে তাকে চেলসি সাইন করান। তারপর ২০০৪ সাল। চেলসিতে যোগ দেওয়ার পর প্রথম প্রেস কনফারেন্সে মরিনো বলেছিলেনঃ

"Please don't call me arrogant, but I'm European champion and I think I'm a special one."

এই একটি কথাই তাকে রাতারাতি তারকা বানিয়ে দেয়। তিনি শুধু কথা বলেই ক্ষান্ত হননি, চেলসিকে ৫০ বছর পর লিগ শিরোপা জিতিয়ে প্রমাণ করেছিলেন যে তিনি আসলেই স্পেশাল। কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে সে বছর চেলসি মাত্র ১৫ গোল হজম করে যা প্রিমিয়ার লিগের সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো বিষয়। নিজের ওপর এই অটুট আত্মবিশ্বাসই তাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে।

২. ট্যাকটিক্যাল মাস্টারমাইন্ড ও 'বাস পার্কিং'

মরিনোর খেলার ধরন অনেকে পছন্দ করেন না, কারণ তিনি ডিফেন্স বা রক্ষণভাগকে খুব গুরুত্ব দেন। কিন্তু তার এই 'প্রাগমেটিক' (Pragmatic) স্টাইলই তাকে ট্রফি এনে দিয়েছে।

ডিফেন্সিভ অর্গানাইজেশনঃ তার দল গোল করার চেয়ে গোল না খাওয়ার দিকে বেশি ফোকাস করে।

কাউন্টার অ্যাটাকঃ প্রতিপক্ষ যখন আক্রমণের নেশায় মগ্ন থাকে, ঠিক তখনই মরিনোর দল পাল্টা আক্রমণে গোল করে ম্যাচ শেষ করে দেয়।

ইন্টার মিলান বনাম বার্সেলোনা (২০১০): এই ম্যাচটি মরিনোর ট্যাকটিক্সের সেরা উদাহরণ। ১০ জন নিয়ে খেলে তিনি পেপ গার্দিওলার দুর্ধর্ষ বার্সেলোনাকে আটকে দিয়েছিলেন। যার হাইলাইটস এখনো ইউটিউবে ফ্রী দেখতে পারবেন। সেই ম্যাচে মাত্র ২৮ মিনিটেই ইন্টার মিলান লাল কার্ড দেখতে পান। এবং পরবর্তী পুরা ম্যাচ ছিল মেসি ও পেপ গার্দিওলার নিজের ঘরের মাঠে কিন্তু তারা একটা মাত্র গোল করতে সক্ষম হোন এবং পরবর্তী ইন্টার মিলান জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ার পিছনের রহস্যময় ব্যক্তিটিই হলেন জসে মরিনো।

রিয়াম মাদ্রিদঃ জসে মরিনো রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে কোচিং করিয়েছেন। তিনি এই ক্লাবের হয়েও এক অন্যান্য রেকর্ড করে গিয়েছেন। তা হলো একটি লিগে সর্বোচ্চ পয়েন্ট অর্জন করা। যা ছিল রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সালোনার প্রাইম সময়ে রিয়াল মাদ্রিদ লা-লিগায় টেবিল টপার ছিল এবং টফি জয় করে ১০০ পয়েন্ট নিয়ে। যা মনে হতে পারে কিছুই না তবে এই রকম পয়েন্ট একটা লিগে তাও লা-লিগায় প্রাইম বার্সেলোনা থাকাকালীন করে দেখিয়েছেন এই 'দ্য স্পেশাল ওয়ান' জসে মরিনো। 

৩. আন্ডারডগদের চ্যাম্পিয়ন

বড় বাজেট ছাড়াও যে বড় দলগুলোকে হারানো যায়, তা মরিনো বারবার প্রমাণ করেছেন।

এফসি পোর্তোঃ ২০০৪ সালে পর্তুগালের ক্লাব এফসি পোর্তোকে নিয়ে তিনি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছিলেন, যা ছিল এক কথায় অবিশ্বাস্য।

এএস রোমাঃ বহু বছর শিরোপাহীন থাকা রোমাকে তিনি ২০২২ সালে 'উয়েফা কনফারেন্স লিগ' জিতিয়েছিলেন। তিনি একমাত্র কোচ যিনি ইউরোপের তিনটি ভিন্ন মেজর ট্রফি জিতেছেন।

৪. প্লেয়ারদের সাথে মানসিক সংযোগ (Man Management)

জসে মরিনোর অন্যতম বড় গুণ হলো প্লেয়ারদের মনস্তত্ত্ব বোঝা। তার জন্য প্লেয়াররা মাঠে জীবন দিতেও প্রস্তুত থাকেন। দিদিয়ের দ্রগবা, ওয়েসলি স্নেইডার, বা মার্কো মাতেরাজ্জির মতো কিংবদন্তিরা মরিনোকে নিজেদের 'বাবা' বা 'বড় ভাই'-এর মতো শ্রদ্ধা করেন। তিনি জানেন কীভাবে একজন খেলোয়াড়ের ভেতর থেকে তার সেরাটা বের করে আনতে হয়।

৫. মাইন্ড গেম এবং সাইকোলজিক্যাল যুদ্ধ

মাঠের খেলার আগেই মরিনো প্রতিপক্ষকে কথার মাধ্যমে মানসিকভাবে দুর্বল করে দেন। প্রেস কনফারেন্সে তিনি এমন সব কথা বলেন যা প্রতিপক্ষের কোচ এবং খেলোয়াড়দের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এই 'মাইন্ড গেম' ফুটবলে তাকে অদ্বিতীয় করে তুলেছে।

৬. সাফল্যের পরিসংখ্যান

মরিনো কেন স্পেশাল, তার প্রমাণ তার ট্রফি কেবিনেটঃ

  • ২টি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ (পোর্তো ও ইন্টার মিলান)।
  • ইংল্যান্ড, স্পেন, ইতালি এবং পর্তুগাল—চারটি ভিন্ন দেশে লিগ শিরোপা জয়।
  • মোট ট্রফি সংখ্যা ২৬টিরও বেশি।

শেষ কথা

জসে মরিনোর কোচিং স্টাইল হয়তো সবার পছন্দ নয়। তার রক্ষণাত্মক ভঙ্গি বা বিতর্কিত মন্তব্যের সমালোচনা হতে পারে। কিন্তু দিনশেষে ফুটবল হলো ফলাফলের খেলা। আর ফলাফল বের করে আনার ক্ষেত্রে জসে মরিনো এক অনন্য জাদুকর। তার ক্যারিশমা, বুদ্ধিমত্তা এবং জয়ের ক্ষুধা তাকে ফুটবলের ইতিহাসে চিরকাল 'দ্য স্পেশাল ওয়ান' হিসেবে বাঁচিয়ে রাখবে।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

১. জসে মরিনোকে কেন 'দ্য স্পেশাল ওয়ান' বলা হয়?

২০০৪ সালে চেলসিতে যোগ দেওয়ার সময় তিনি নিজেকে 'স্পেশাল ওয়ান' দাবি করেছিলেন এবং পরবর্তীতে তার সাফল্যের মাধ্যমে তা প্রমাণ করেছিলেন।

২. মরিনো কোন কোন ক্লাবে কোচিং করিয়েছেন?

তিনি পোর্তো, চেলসি, ইন্টার মিলান, রিয়াল মাদ্রিদ, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, টটেনহ্যাম, এএস রোমা এবং ফেনারবাচের মতো ক্লাবে কোচিং করিয়েছেন।

৩. মরিনো কি সর্বকালের সেরা কোচ?

এটি তর্কের বিষয়। তবে ট্রফি সংখ্যা এবং বিভিন্ন দেশে সাফল্যের বিচারে তিনি নিঃসন্দেহে সর্বকালের অন্যতম সেরা কোচদের একজন।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন