চোখ উঠার লক্ষণ ও দ্রুত সেরে ওঠার সহজ উপায় ও সতর্কতা
ঋতু পরিবর্তনের সময় কিংবা হঠাৎ করেই সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলেন চোখ লাল হয়ে আছে, ব্যথা করছে কিংবা চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। আমাদের দেশে এটি খুব সাধারণ একটি সমস্যা, যাকে আমরা প্রচলিত ভাষায় "চোখ ওঠা" বলে থাকি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় কনজাংটিভাইটিস (Conjunctivitis)। এটি ছোঁয়াচে রোগ হওয়ায় খুব দ্রুত একজন থেকে অন্যজনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
আজকের এই ব্লগে আমরা জানবো চোখ উঠার লক্ষণ, এর ঘরোয়া চিকিৎসা এবং চোখ উঠলে কি কি সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।
চোখ উঠার প্রধান লক্ষণসমূহ (Symptoms of Pink Eye)
চোখ ওঠার সমস্যাটি ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া কিংবা অ্যালার্জির কারণে হতে পারে। তবে কারণ যাই হোক, লক্ষণগুলো সাধারণত একই রকম হয়। নিচে প্রধান লক্ষণগুলো দেওয়া হলোঃ
চোখ লাল হয়ে যাওয়াঃ চোখের সাদা অংশ টকটকে লাল বা গোলাপি বর্ণ ধারণ করে।
চোখ দিয়ে পানি পড়াঃ অনবরত চোখ দিয়ে পানি পড়তে থাকে।
চোখে ব্যথা ও খচখচ ভাবঃ মনে হয় চোখের ভেতর বালি বা ধুলো পড়েছে।
চোখ ফুলে যাওয়াঃ চোখের পাতা বা চোখের চারপাশ ফুলে যেতে পারে।
পিচুটি জমাঃ সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর চোখের কোণায় হলুদ বা সাদা আঠালো পদার্থ (পিচুটি) জমে চোখ আটকে থাকে।
আলোর প্রতি সংবেদনশীলতাঃ তীব্র আলো বা রোদে তাকাতে কষ্ট হয়।
চোখ উঠলে ঘরোয়া চিকিৎসা (Home Remedies)
সাধারণত ভাইনাল কনজাংটিভাইটিস বা চোখ ওঠা ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যে আপনা-আপনিই ভালো হয়ে যায়। তবে চোখের আরামের জন্য এবং দ্রুত সুস্থতার জন্য কিছু ঘরোয়া উপায় মেনে চলতে পারেনঃ
১. চোখে গরম বা ঠান্ডা ভাপ (Compress)
চোখের ফোলা ভাব ও ব্যথা কমাতে পরিষ্কার সুতি কাপড় হালকা গরম পানিতে ভিজিয়ে চিপে নিন। এরপর বন্ধ চোখের ওপর আলতো করে ধরুন। এটি দিনে ৩-৪ বার করতে পারেন। যদি অ্যালার্জিজনিত কারণে চোখ চুলকায়, তবে ঠান্ডা পানির ভাপ আরামদায়ক হতে পারে।
২. কালো চশমা ব্যবহার করা
চোখ উঠলে আলোতে তাকাতে বেশ কষ্ট হয়। তাই রোদে বা ঘরের বাইরে গেলে অবশ্যই কালো চশমা বা সানগ্লাস ব্যবহার করুন। এটি ধুলোবালি থেকেও চোখকে রক্ষা করবে এবং বারবার চোখে হাত দেওয়া থেকে আপনাকে বিরত রাখবে।
৩. চোখ পরিষ্কার রাখা
চোখে পিচুটি জমলে তা পরিষ্কার করার জন্য ফুটানো পানি ঠান্ডা করে নিন। এরপর পরিষ্কার তুলা বা নরম কাপড় সেই পানিতে ভিজিয়ে চোখের কোণা পরিষ্কার করুন। মনে রাখবেন, এক চোখের জন্য ব্যবহৃত তুলা অন্য চোখে ব্যবহার করবেন না।
৪. পর্যাপ্ত বিশ্রাম
চোখের বিশ্রামের জন্য পর্যাপ্ত ঘুম জরুরি। এসময় মোবাইল, কম্পিউটার বা টিভির স্ক্রিন থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকার চেষ্টা করুন। এতে চোখের ওপর চাপ কমবে।
চোখ উঠলে যা করবেন এবং যা করবেন না (Dos and Don'ts)
সুস্থতার জন্য কিছু নিয়ম মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি।
কি করবেন (Dos):
- ব্যক্তিগত ব্যবহারের তোয়ালে, বালিশের কভার, রুমাল আলাদা রাখুন।
- বাইরে থেকে এসে এবং চোখে হাত দেওয়ার আগে ও পরে সাবান দিয়ে ভালো করে হাত ধুয়ে নিন।
- প্রচুর পরিমাণে পানি ও ভিটামিন-সি যুক্ত খাবার খান।
কি করবেন না (Don'ts):
চোখ ডলবেন নাঃ চোখ চুলকালেও হাত দিয়ে রগড়াবেন না, এতে সংক্রমণ আরও বেড়ে যেতে পারে।
কন্টাক্ট লেন্স ব্যবহার নিষেধঃ চোখ না ভালো হওয়া পর্যন্ত কন্টাক্ট লেন্স ব্যবহার করবেন না।
অন্যের ড্রপ ব্যবহার করবেন নাঃ ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ফার্মেসি থেকে কিনে বা অন্যের ব্যবহৃত আই ড্রপ চোখে দেবেন না।
কখন ডাক্তারের পরামর্শ নেবেন?
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চোখ ওঠা সাধারণ পরিচর্যাতেই ভালো হয়ে যায়। তবে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিতঃ
- যদি ৭-১০ দিনের পরেও চোখ ভালো না হয়।
- চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে গেলে বা দেখতে সমস্যা হলে।
- চোখের মণি বা কর্নিয়াতে সাদা দাগ দেখা দিলে।
- চোখের ব্যথা অসহনীয় হলে।
- নবজাতক শিশুর চোখ উঠলে কোনোভাবেই ঘরোয়া চিকিৎসা করবেন না, সরাসরি ডাক্তারের কাছে যাবেন।
উপসংহার
চোখ আমাদের শরীরের অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি অঙ্গ। চোখ উঠার লক্ষণ ও ঘরোয়া চিকিৎসা সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকলে ভয়ের কিছু নেই। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং নিয়ম মেনে চললে খুব দ্রুত এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। নিজে সচেতন হোন এবং পরিবারের অন্য সদস্যদেরও সতর্ক রাখুন।
বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ এই ব্লগের তথ্যগুলো সাধারণ সচেতনতার জন্য। চোখের যেকোনো জটিল সমস্যায় অবশ্যই রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন