বেরিবেরি রোগ কি ও রোগের লক্ষণ

বেরিবেরি রোগ কি ও রোগের লক্ষণ


বেরিবেরি রোগ কি ও রোগের লক্ষণ

আমাদের শরীর সুস্থ রাখার জন্য বিভিন্ন ভিটামিনের প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে কোনো একটির অভাব দেখা দিলে শরীরে বাসা বাঁধে নানা জটিল রোগ। এমনই একটি রোগ হলো "বেরিবেরি' (Beriberi)" অনেকের কাছেই এই নামটি পরিচিত হলেও, এর সঠিক কারণ ও লক্ষণ সম্পর্কে ধারণা নেই। আজকের আর্টিকেলে আমরা সহজ ভাষায় আলোচনা করবো "বেরিবেরি রোগ কি ও রোগের লক্ষণ" সম্পর্কে, যাতে আপনি নিজের এবং পরিবারের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারেন।

বেরিবেরি রোগ কি? (What is Beriberi Disease?)

সহজ কথায়, শরীরে "ভিটামিন বি-১ (Vitamin B-1)" বা "থায়ামিন (Thiamine)"-এর মারাত্মক অভাব দেখা দিলে যে রোগ হয়, তাকেই বেরিবেরি রোগ বলা হয়।

আমাদের শরীর শর্করা জাতীয় খাবার থেকে শক্তি উৎপাদন করতে থায়ামিন ব্যবহার করে। যখন শরীরে পর্যাপ্ত থায়ামিন থাকে না, তখন হার্ট বা হৃদপিণ্ড এবং স্নায়ুতন্ত্র বা নার্ভাস সিস্টেম ঠিকমতো কাজ করতে পারে না।

বেরিবেরি মূলত দুই প্রকারের হয়ে থাকেঃ

১. "ওয়েট বেরিবেরি (Wet Beriberi):" এটি মূলত হৃদপিণ্ড বা হার্ট এবং রক্ত সঞ্চালন ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

২. "ড্রাই বেরিবেরি (Dry Beriberi):" এটি শরীরের স্নায়ুতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং পেশীর শক্তি কমিয়ে দেয়।

বেরিবেরি রোগের লক্ষণ (Symptoms of Beriberi)

বেরিবেরি রোগের লক্ষণগুলো নির্ভর করে এটি কোন ধরনের (ওয়েট নাকি ড্রাই) তার ওপর। নিচে প্রধান লক্ষণগুলো তুলে ধরা হলোঃ

১. ড্রাই বেরিবেরি (Dry Beriberi)-এর লক্ষণঃ

এই ধরণটি স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রমণ করে, ফলে নিচের সমস্যাগুলো দেখা দেয়ঃ

  • হাত ও পায়ে ঝিনঝিন করা বা অবশ ভাব হওয়া।
  • হাঁটতে অসুবিধা হওয়া বা হাঁটার সময় পায়ে শক্তি না পাওয়া।
  • পায়ের নিচের দিকের পেশীতে তীব্র ব্যথা বা টান লাগা।
  • কথা বলতে জড়তা বা কষ্ট হওয়া।
  • মানসিক বিভ্রান্তি বা স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া।
  • হঠাৎ করে চোখ নড়াচড়া করতে সমস্যা হওয়া (Nystagmus)।

২. ওয়েট বেরিবেরি (Wet Beriberi)-এর লক্ষণঃ

এটি হার্টের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এর লক্ষণগুলো হলোঃ

  • অল্প পরিশ্রমেই শ্বাসকষ্ট হওয়া বা দম ফুরিয়ে আসা।
  • বুক ধড়ফড় করা বা হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া।
  • পা এবং পায়ের পাতা ফুলে যাওয়া (Water retention)।
  • রাতে ঘুমের মধ্যে শ্বাসকষ্টে জেগে ওঠা।
  • অতিরিক্ত ক্লান্তি বা দুর্বলতা অনুভব করা।

সতর্কতাঃ যদি কারো মধ্যে এই লক্ষণগুলো দেখা যায়, তবে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ ওয়েট বেরিবেরি সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করলে হার্ট ফেইলিওরের কারণ হতে পারে।

বেরিবেরি রোগ কেন হয়? (Causes of Beriberi)

শরীরে থায়ামিন বা ভিটামিন বি-১ এর অভাবই এর মূল কারণ। তবে কিছু নির্দিষ্ট কারণে এই ঝুঁকি বেড়ে যায়ঃ

সাদা চালের ভাতঃ যারা নিয়মিত অতিরিক্ত পলিশ করা সাদা চালের ভাত খান এবং অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার কম খান।

অ্যালকোহল গ্রহণঃ অতিরিক্ত মদ্যপান শরীরকে থায়ামিন শোষণ করতে বাধা দেয়।

বংশগত কারণঃ খুব বিরল ক্ষেত্রে শরীর জন্মগতভাবে থায়ামিন শোষণ করতে পারে না।

গর্ভাবস্থা ও স্তন্যদানঃ গর্ভাবস্থায় বা বাচ্চাকে দুধ খাওয়ানোর সময় মায়ের শরীরে থায়ামিনের চাহিদা বেড়ে যায়, তখন অভাব দেখা দিতে পারে।

কিডনি ডায়ালাইসিসঃ যারা নিয়মিত ডায়ালাইসিস করেন তাদের এই ঝুঁকি থাকে।

বেরিবেরি রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা

চিকিৎসক সাধারণত শারীরিক পরীক্ষা এবং রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষার মাধ্যমে শরীরে থায়ামিনের মাত্রা চেক করেন।

চিকিৎসা পদ্ধতিঃ বেরিবেরি রোগের চিকিৎসা বেশ সহজ যদি তা প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়ে।

সাপ্লিমেন্টঃ ডাক্তার রোগীকে থায়ামিন ট্যাবলেট বা ইনজেকশন দিয়ে থাকেন।

খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনঃ প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন বি-১ সমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

ভিটামিন বি-১ সমৃদ্ধ খাবার (Foods Rich in Thiamine)

বেরিবেরি প্রতিরোধে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় নিচের খাবারগুলো রাখা জরুরিঃ

  • ঢেঁকি ছাঁটা চাল বা লাল চাল।
  • লাল আটা।
  • ডাল এবং মটরশুটি।
  • বাদাম ও বীজ জাতীয় খাবার।
  • মাছ ও মাংস।
  • সবুজ শাকসবজি (যেমন- পালং শাক)।
  • দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার।

শেষ কথা

"প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম।" বেরিবেরি রোগটি মূলত অপুষ্টিজনিত সমস্যা। তাই সুষম খাদ্য গ্রহণ এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করলে এই রোগ থেকে সহজেই দূরে থাকা সম্ভব। আপনার যদি মনে হয় আপনার শরীরে "বেরিবেরি রোগের লক্ষণ" দেখা দিচ্ছে, তবে অবহেলা না করে আজই একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন। 

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন